ধর্মের দু’টি দিক: আচার ও অনুশীলন
উপালি শ্রমণ
ধর্ম চর্চার দুইটি গুরুত্ত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে —আচার এবং অনুশীলন। অনেকের কাছে এদের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম বলে মনে হতে পারে। আচার এবং অনুশীলনের মধ্যে অবশ্যই গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সম্পর্ক থাকলেও তারা এক জিনিস নয়। বরং ধর্মকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এই দুইয়ের পার্থক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক ভালোভাবে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আচার হচ্ছে সেইসব ধর্মীয় রীতি, অনুষ্ঠান ও আচরণ যা আমরা মূলত ঐতিহ্য এবং পরম্পরাগতভাবে শিখে থাকি। জন্মের আগেই মানুষ এক অর্থে আচারের জগতে প্রবেশ করে। আমাদের পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বড় করে তোলে। ফলে আমরা সচেতনভাবে কিছু শেখার আগেই অনেক ধর্মীয় আচারের অংশ হয়ে যাই।
উদাহরণস্বরূপ, একজন গর্ভবতী মাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা ধর্মীয় আচার প্রচলিত আছে। অনাগত শিশুর মঙ্গল, নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন প্রার্থনা, আশীর্বাদ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বৌদ্ধ সমাজেও এর ব্যতিক্রম নেই। অনেক বৌদ্ধ পরিবার গর্ভবতী মায়ের কল্যাণ ও সন্তানের নিরাপদ জন্মের জন্য ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পরিত্রাণ সূত্র পাঠ করান। শ্রীলঙ্কায় বিভিন্ন হাসপাতালের মেটার্নিটি ওয়ার্ডে ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ করে অঙ্গুলিমাল পরিত্ত পাঠ করার রীতি আছে। আমিও বেশ কয়েকবার এতে অংশগ্রহণ করেছি। গর্ভবতী মায়েদের সামনে সেই পরিত্রাণ পাঠের অভিজ্ঞতা আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে যে ধর্মীয় আচার কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড নয়; এগুলো মানুষের আশা, ভয়, উদ্বেগ ও আশীর্বাদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
শিশুর জন্মের পরেও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা নানা আচারের সম্মুখীন হই। অন্নপ্রাশন, শিক্ষাজীবনের সূচনা, বিবাহ, নতুন গৃহ নির্মাণ, নতুন ব্যবসা শুরু করা, অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ কিংবা মৃত্যুর পর স্মরণানুষ্ঠান—সবকিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনো ধর্মীয় আচার জড়িত। এসব আচার মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে এবং ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ সৃষ্টি করে।
বৌদ্ধ সমাজে সংঘদান, কঠিন চীবর দান, বুদ্ধপূজা, উপোসথ পালন, প্রাত্যহিক বন্দনা—এসবও আচারের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এসব আচারের গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সাধারণ মানুষ এসব আচার পালন করলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে খুব গভীরভাবে চিন্তা করেন না। তারা পরিবার ও সমাজ থেকে যা শিখেছেন, সেটিই অনুসরণ করেন। এতে কোনো দোষ নেই। কারণ আচার মূলত অনুকরণের মাধ্যমে শেখা হয়। শিশুরা যেমন বড়দের দেখে কথা বলতে শেখে, তেমনি ধর্মীয় আচরণও মানুষ অন্যদের দেখে, অনুসরণ ও অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে নিজের জীবনের অংশ করে তোলে।
কিন্তু ধর্মের আরেকটি দিক আছে, যা আচারের চেয়েও গভীর। সেটি হচ্ছে অনুশীলন।
অনুশীলন বলতে বোঝায় সচেতন চর্চা। এখানে ব্যক্তি কেবল সমাজের প্রচলিত রীতি অনুসরণ করে না; বরং নিজের আত্মিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য নিজেই উদ্যোগী হয়। ধর্ম তখন কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়; বরং ব্যক্তিগত চারিত্রিক গঠনের একটি পথ হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা বিশ্বে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট বহু মানুষের মধ্যে আমরা এই প্রবণতা স্পষ্ট দেখতে পাই। তাদের অনেকেই বৌদ্ধ আচারের সঙ্গে পরিচিত নন। ভিক্ষুদের কীভাবে অভিবাদন করতে হয়, সংঘদান কী, অষ্টপরিষ্কার কী, কঠিন চীবর দানের তাৎপর্য কী—এসব বিষয়ে তারা প্রায়ই অজ্ঞাত থাকেন। কিন্তু তারা ধর্মের অনুশীলনের প্রতি গভীর আগ্রহী। ধ্যানচর্চা তাদের অনেকের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তারা মনকে প্রশিক্ষিত করতে চান, ক্রোধ কমাতে চান, সহমর্মিতা বাড়াতে চান, নিজের জীবনকে আরও সচেতন ও অর্থপূর্ণ করতে চান।
শুধু ধ্যানই নয়, অনেকেই দান, স্বেচ্ছাসেবা বা সমাজসেবার মাধ্যমে ধর্মকে জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করেন। তারা ধর্মকে ব্যবহার করেন নিজেদের নৈতিক চরিত্র গঠনের উপায় হিসেবে। অর্থাৎ তাদের কাছে ধর্ম কেবল কোনো অনুষ্ঠান নয়; বরং আত্মরূপান্তরের একটি প্রকল্প। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অথবা বৌদ্ধ দেশ ভ্রমণ করে বৌদ্ধ আচারাদির প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
তবে আচার ও অনুশীলনকে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বরং আমাদের আচারের বিভিন্ন উপলক্ষই অনুশীলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতপক্ষে আচার তখনই গভীর অর্থ লাভ করে, যখন তা অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ধরা যাক, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা ত্রিশরণ ও পঞ্চশীল গ্রহণ করছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সূত্রের ভাষাগুলো উচ্চারণ করি। কিন্তু যদি আমরা একটু থেমে ভাবি—আমি কী বলছি, কেন বলছি, এর অর্থ কী—তাহলেই আচার অনুশীলনে রূপ নিতে শুরু করে।
ত্রিশরণ গ্রহণের কথাই ধরা যাক। আমরা বলি, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামি।” এখানে “শরণ” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শরণ নেয় কারা? সাধারণত তারা, যাদের নিরাপত্তা নেই। আমরা যুদ্ধের শরণার্থীদের কথা জানি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যায়। মানুষ তখনই শরণ নেয়, যখন সে বিপদের মধ্যে থাকে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন অনুভব করে।
বৌদ্ধধর্মে ত্রিশরণ গ্রহণের পেছনেও একই ধরনের উপলব্ধি কাজ করে। আমরা স্বীকার করি যে আমরা দুঃখ, অস্থিরতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে বাস করছি। আমাদের মন লোভ, ক্রোধ, হিংসা, ঈর্ষা, ভয় এবং আত্মকেন্দ্রিকতার দ্বারা বারবার প্রভাবিত হয়। এই প্রবৃত্তিগুলো কেবল অন্যের ক্ষতি করে না; এগুলো আমাদের নিজেদের দুঃখেরও কারণ হয়। আমরা বারবার ভুল করি, কষ্ট পাই, অন্যকে কষ্ট দিই এবং অশান্তির চক্রে আবর্তিত হই।
এই অবস্থায় আমাদের এমন এক পথপ্রদর্শক দরকার, যিনি এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারেন। আমাদের এমন এক শিক্ষা দরকার, যা দুঃখের কারণ ব্যাখ্যা করে এবং মুক্তির উপায় নির্দেশ করে। আমাদের এমন এক কল্যাণমিত্র বা সম্প্রদায় দরকার, যারা সেই পথ অনুসরণ করে এবং আমাদের সহায়তা করতে পারে।
এই কারণেই আমরা বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘে শরণ গ্রহণ করি।
কিন্তু যদি ত্রিশরণ গ্রহণ কেবল মুখে উচ্চারিত কিছু বাক্য হয়ে থাকে, তাহলে তার গভীরতা সীমিত থেকে যায়। বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রতি আস্থা না থাকলে, তাদের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করার আন্তরিক ইচ্ছা না থাকলে, ত্রিশরণ কেবল একটি আচার হিসেবেই থেকে যায়। অন্যদিকে, যদি ত্রিশরণ গ্রহণের মুহূর্তে আমরা নিজের মনের দিকে তাকাই, নিজের ভয়, লোভ, ক্রোধ ও অজ্ঞতার উপস্থিতি স্বীকার করি, এবং সেই সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করার প্রতিজ্ঞা করি, তাহলে সেটি অনুশীলনের সূচনা হয়ে ওঠে।
একই কথা পঞ্চশীলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা যদি কেবল শীলের বাক্যগুলো উচ্চারণ করি, তাহলে তা আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি সত্যিই নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি প্রাণী ও অন্যান্য জীবের প্রতি অহিংস আচরণ করি? আমি কি অন্যকে ঠকিয়ে বা অন্যায় উপায়ে পরের সম্পদ আত্মসাৎ করি? আমি কি সত্য ভাষণ করি? আমি কি যৌন আচরণে দায়িত্বশীল ও সংযত? আমি কি মাদক ও মাদকজাত দ্রব্য সেবন করে নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হই?—তাহলে পঞ্চশীল আর কেবল উচ্চারিত কিছু বাক্য থাকে না; তা আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং চরিত্রগঠনের এক চলমান অনুশীলনে পরিণত হয়।
পঞ্চশীলের মধ্যে মিথ্যা বাক্য পরিহারের শীলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এমন অনেক পরিস্থিতি আছে যেখানে একজন মানুষকে প্রতিদিন প্রাণী হত্যা, চুরি, যৌন অসদাচরণ বা মাদক সেবনের প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কিংবা বৃহত্তর সমাজে—প্রতিদিনই আমরা বাক্যের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করি। তাই আমরা কী বলি, কীভাবে বলি এবং কোন উদ্দেশ্যে বলি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বুদ্ধ বাক্যের চারটি প্রধান অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো মিথ্যা বলা বা সত্যকে বিকৃত করা, কটু ও কঠোর বাক্যের মাধ্যমে অন্যকে আঘাত করা, অর্থহীন ও উদ্দেশ্যহীন প্রলাপে সময় নষ্ট করা, এবং একের কথা অন্যের কাছে বলে বিভেদ সৃষ্টি করা বা পরনিন্দায় লিপ্ত হওয়া। দৈনন্দিন জীবনে এসব দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সহজ নয়। কখনও রাগের বশে, কখনও অভ্যাসবশত, আবার কখনও অসচেতনভাবে আমরা এমন কথা বলে ফেলি যা নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়। তাই বাক্যের প্রতি সতর্কতা ও সচেতনতা ধর্মীয় অনুশীলনের একটি অপরিহার্য অংশ। যখন আমাদের কথা সত্যনিষ্ঠ, কল্যাণকর, কোমল ও সম্প্রীতিসাধক হয়, তখন তা শুধু অন্যের উপকারই করে না; ধীরে ধীরে আমাদের নিজেদের মন ও চরিত্রকেও পরিশুদ্ধ ও পরিণত করে তোলে।
সুতরাং ধর্মের আচার ও অনুশীলন—উভয়েরই গুরুত্ব রয়েছে। আচার আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সম্প্রদায়বোধ গড়ে তোলে। অনুশীলন সেই ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তোলে এবং ব্যক্তির অন্তর্জগতে পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়। আচার ছাড়া ধর্ম শিকড়হীন হয়ে যেতে পারে; আবার অনুশীলন ছাড়া ধর্ম প্রাণহীন হয়ে পড়তে পারে।
আধুনিক যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির দোহাই দিয়ে অনেকেই ধর্মীয় আচারকে তুচ্ছ, সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি পরিবার, একটি সমাজ কিংবা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিজেদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও পরিচয় অনেকাংশে আচারের মাধ্যমেই সংরক্ষণ করে। তাই আচার কেবল কিছু বাহ্যিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি নয়; এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামষ্টিক পরিচয়েরও বাহক।
একই সঙ্গে আচার ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে। মানুষ একা নয়; সে সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে ধর্মচর্চা করে। সেই সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখতে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে জীবন্ত রাখতে আচারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই আচারকে অযথা অবজ্ঞা করার কোনো কারণ নেই। তবে সব আচার সমানভাবে মূল্যবান নয়। যে আচার মানুষের ক্ষতি করে, অজ্ঞতা ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করে, বা কুসংস্কারের জন্ম দেয়, তা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু যে আচার মানুষকে সংযুক্ত করে, নৈতিক মূল্যবোধকে লালন করে এবং ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রকে রক্ষা করে, তাকে সংরক্ষণ ও লালন করা আমাদের দায়িত্ব।
ধর্মের পূর্ণতা তখনই আসে, যখন আচার ও অনুশীলন একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। বাহ্যিক আচারের মাধ্যমে আমরা ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হই, আর সচেতন অনুশীলনের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে নিজের জীবনের অংশ করে তুলি। তখন ধর্ম আর কেবল মন্দিরে পালন করা কোনো অনুষ্ঠান থাকে না; তা আমাদের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনযাপনের রূপান্তরকারী শক্তিতে পরিণত হয়।
(Dr. Upali Sraman, Lecturer in Buddhist languages and Cultures, University of Edinburgh, Scotland, UK)