ধর্মের দু’টি দিক: আচার ও অনুশীলন

ধর্মের দুটি দিক: আচার অনুশীলন

উপালি শ্রমণ

ধর্ম চর্চার দুইটি গুরুত্ত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে —আচার এবং অনুশীলন। অনেকের কাছে এদের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম বলে মনে হতে পারে। আচার এবং অনুশীলনের মধ্যে অবশ্যই গভীর সম্পর্ক রয়েছে।   কিন্তু সম্পর্ক থাকলেও তারা এক জিনিস নয়। বরং ধর্মকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এই দুইয়ের পার্থক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক ভালোভাবে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আচার হচ্ছে সেইসব ধর্মীয় রীতি, অনুষ্ঠান ও আচরণ যা আমরা মূলত ঐতিহ্য এবং পরম্পরাগতভাবে শিখে থাকি। জন্মের আগেই মানুষ এক অর্থে আচারের জগতে প্রবেশ করে। আমাদের পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বড় করে তোলে। ফলে আমরা সচেতনভাবে কিছু শেখার আগেই অনেক ধর্মীয় আচারের অংশ হয়ে যাই।

উদাহরণস্বরূপ, একজন গর্ভবতী মাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা ধর্মীয় আচার প্রচলিত আছে। অনাগত শিশুর মঙ্গল, নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন প্রার্থনা, আশীর্বাদ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বৌদ্ধ সমাজেও এর ব্যতিক্রম নেই। অনেক বৌদ্ধ পরিবার গর্ভবতী মায়ের কল্যাণ ও সন্তানের নিরাপদ জন্মের জন্য ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পরিত্রাণ সূত্র পাঠ করান। শ্রীলঙ্কায় বিভিন্ন হাসপাতালের মেটার্নিটি ওয়ার্ডে ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ করে অঙ্গুলিমাল পরিত্ত পাঠ করার রীতি আছে। আমিও বেশ কয়েকবার এতে অংশগ্রহণ করেছি। গর্ভবতী মায়েদের সামনে সেই পরিত্রাণ পাঠের অভিজ্ঞতা আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে যে ধর্মীয় আচার কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড নয়; এগুলো মানুষের আশা, ভয়, উদ্বেগ ও আশীর্বাদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

শিশুর জন্মের পরেও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা নানা আচারের সম্মুখীন হই। অন্নপ্রাশন, শিক্ষাজীবনের সূচনা, বিবাহ, নতুন গৃহ নির্মাণ, নতুন ব্যবসা শুরু করা, অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ কিংবা মৃত্যুর পর স্মরণানুষ্ঠান—সবকিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনো ধর্মীয় আচার জড়িত। এসব আচার মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে এবং ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ সৃষ্টি করে।

বৌদ্ধ সমাজে সংঘদান, কঠিন চীবর দান, বুদ্ধপূজা, উপোসথ পালন, প্রাত্যহিক বন্দনা—এসবও আচারের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এসব আচারের গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সাধারণ মানুষ এসব আচার পালন করলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে খুব গভীরভাবে চিন্তা করেন না। তারা পরিবার ও সমাজ থেকে যা শিখেছেন, সেটিই অনুসরণ করেন। এতে কোনো দোষ নেই। কারণ আচার মূলত অনুকরণের মাধ্যমে শেখা হয়। শিশুরা যেমন বড়দের দেখে কথা বলতে শেখে, তেমনি ধর্মীয় আচরণও মানুষ অন্যদের দেখে, অনুসরণ ও অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে নিজের জীবনের অংশ করে তোলে।

কিন্তু ধর্মের আরেকটি দিক আছে, যা আচারের চেয়েও গভীর। সেটি হচ্ছে অনুশীলন।

অনুশীলন বলতে বোঝায় সচেতন চর্চা। এখানে ব্যক্তি কেবল সমাজের প্রচলিত রীতি অনুসরণ করে না; বরং নিজের আত্মিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য নিজেই উদ্যোগী হয়। ধর্ম তখন কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়; বরং ব্যক্তিগত চারিত্রিক গঠনের একটি পথ হয়ে ওঠে।

পশ্চিমা বিশ্বে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট বহু মানুষের মধ্যে আমরা এই প্রবণতা স্পষ্ট দেখতে পাই। তাদের অনেকেই বৌদ্ধ আচারের সঙ্গে পরিচিত নন। ভিক্ষুদের কীভাবে অভিবাদন করতে হয়, সংঘদান কী, অষ্টপরিষ্কার কী, কঠিন চীবর দানের তাৎপর্য কী—এসব বিষয়ে তারা প্রায়ই অজ্ঞাত থাকেন। কিন্তু তারা ধর্মের অনুশীলনের প্রতি গভীর আগ্রহী। ধ্যানচর্চা তাদের অনেকের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তারা মনকে প্রশিক্ষিত করতে চান, ক্রোধ কমাতে চান, সহমর্মিতা বাড়াতে চান, নিজের জীবনকে আরও সচেতন ও অর্থপূর্ণ করতে চান।

শুধু ধ্যানই নয়, অনেকেই দান, স্বেচ্ছাসেবা বা সমাজসেবার মাধ্যমে ধর্মকে জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করেন। তারা ধর্মকে ব্যবহার করেন নিজেদের নৈতিক চরিত্র গঠনের উপায় হিসেবে। অর্থাৎ তাদের কাছে ধর্ম কেবল কোনো অনুষ্ঠান নয়; বরং আত্মরূপান্তরের একটি প্রকল্প। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অথবা বৌদ্ধ দেশ ভ্রমণ করে বৌদ্ধ আচারাদির প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

তবে আচার ও অনুশীলনকে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বরং আমাদের আচারের বিভিন্ন উপলক্ষই অনুশীলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতপক্ষে আচার তখনই গভীর অর্থ লাভ করে, যখন তা অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ধরা যাক, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা ত্রিশরণ ও পঞ্চশীল গ্রহণ করছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সূত্রের ভাষাগুলো উচ্চারণ করি। কিন্তু যদি আমরা একটু থেমে ভাবি—আমি কী বলছি, কেন বলছি, এর অর্থ কী—তাহলেই আচার অনুশীলনে রূপ নিতে শুরু করে।

ত্রিশরণ গ্রহণের কথাই ধরা যাক। আমরা বলি, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামি।” এখানে “শরণ” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শরণ নেয় কারা? সাধারণত তারা, যাদের নিরাপত্তা নেই। আমরা যুদ্ধের শরণার্থীদের কথা জানি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যায়। মানুষ তখনই শরণ নেয়, যখন সে বিপদের মধ্যে থাকে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন অনুভব করে।

বৌদ্ধধর্মে ত্রিশরণ গ্রহণের পেছনেও একই ধরনের উপলব্ধি কাজ করে। আমরা স্বীকার করি যে আমরা দুঃখ, অস্থিরতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে বাস করছি। আমাদের মন লোভ, ক্রোধ, হিংসা, ঈর্ষা, ভয় এবং আত্মকেন্দ্রিকতার দ্বারা বারবার প্রভাবিত হয়। এই প্রবৃত্তিগুলো কেবল অন্যের ক্ষতি করে না; এগুলো আমাদের নিজেদের দুঃখেরও কারণ হয়। আমরা বারবার ভুল করি, কষ্ট পাই, অন্যকে কষ্ট দিই এবং অশান্তির চক্রে আবর্তিত হই।

এই অবস্থায় আমাদের এমন এক পথপ্রদর্শক দরকার, যিনি এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারেন। আমাদের এমন এক শিক্ষা দরকার, যা দুঃখের কারণ ব্যাখ্যা করে এবং মুক্তির উপায় নির্দেশ করে। আমাদের এমন এক কল্যাণমিত্র বা সম্প্রদায় দরকার, যারা সেই পথ অনুসরণ করে এবং আমাদের সহায়তা করতে পারে।

এই কারণেই আমরা বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘে শরণ গ্রহণ করি।

কিন্তু যদি ত্রিশরণ গ্রহণ কেবল মুখে উচ্চারিত কিছু বাক্য হয়ে থাকে, তাহলে তার গভীরতা সীমিত থেকে যায়। বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রতি আস্থা না থাকলে, তাদের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করার আন্তরিক ইচ্ছা না থাকলে, ত্রিশরণ কেবল একটি আচার হিসেবেই থেকে যায়। অন্যদিকে, যদি ত্রিশরণ গ্রহণের মুহূর্তে আমরা নিজের মনের দিকে তাকাই, নিজের ভয়, লোভ, ক্রোধ ও অজ্ঞতার উপস্থিতি স্বীকার করি, এবং সেই সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করার প্রতিজ্ঞা করি, তাহলে সেটি অনুশীলনের সূচনা হয়ে ওঠে।

একই কথা পঞ্চশীলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা যদি কেবল শীলের বাক্যগুলো উচ্চারণ করি, তাহলে তা আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি সত্যিই নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি প্রাণী ও অন্যান্য জীবের প্রতি অহিংস আচরণ করি? আমি কি অন্যকে ঠকিয়ে বা অন্যায় উপায়ে পরের সম্পদ আত্মসাৎ করি? আমি কি সত্য ভাষণ করি? আমি কি যৌন আচরণে দায়িত্বশীল ও সংযত? আমি কি মাদক ও মাদকজাত দ্রব্য সেবন করে নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হই?—তাহলে পঞ্চশীল আর কেবল উচ্চারিত কিছু বাক্য থাকে না; তা আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং চরিত্রগঠনের এক চলমান অনুশীলনে পরিণত হয়।

পঞ্চশীলের মধ্যে মিথ্যা বাক্য পরিহারের শীলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এমন অনেক পরিস্থিতি আছে যেখানে একজন মানুষকে প্রতিদিন প্রাণী হত্যা, চুরি, যৌন অসদাচরণ বা মাদক সেবনের প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কিংবা বৃহত্তর সমাজে—প্রতিদিনই আমরা বাক্যের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করি। তাই আমরা কী বলি, কীভাবে বলি এবং কোন উদ্দেশ্যে বলি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বুদ্ধ বাক্যের চারটি প্রধান অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো মিথ্যা বলা বা সত্যকে বিকৃত করা, কটু ও কঠোর বাক্যের মাধ্যমে অন্যকে আঘাত করা, অর্থহীন ও উদ্দেশ্যহীন প্রলাপে সময় নষ্ট করা, এবং একের কথা অন্যের কাছে বলে বিভেদ সৃষ্টি করা বা পরনিন্দায় লিপ্ত হওয়া। দৈনন্দিন জীবনে এসব দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সহজ নয়। কখনও রাগের বশে, কখনও অভ্যাসবশত, আবার কখনও অসচেতনভাবে আমরা এমন কথা বলে ফেলি যা নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়। তাই বাক্যের প্রতি সতর্কতা ও সচেতনতা ধর্মীয় অনুশীলনের একটি অপরিহার্য অংশ। যখন আমাদের কথা সত্যনিষ্ঠ, কল্যাণকর, কোমল ও সম্প্রীতিসাধক হয়, তখন তা শুধু অন্যের উপকারই করে না; ধীরে ধীরে আমাদের নিজেদের মন ও চরিত্রকেও পরিশুদ্ধ ও পরিণত করে তোলে।

সুতরাং ধর্মের আচার ও অনুশীলন—উভয়েরই গুরুত্ব রয়েছে। আচার আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সম্প্রদায়বোধ গড়ে তোলে। অনুশীলন সেই ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তোলে এবং ব্যক্তির অন্তর্জগতে পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়। আচার ছাড়া ধর্ম শিকড়হীন হয়ে যেতে পারে; আবার অনুশীলন ছাড়া ধর্ম প্রাণহীন হয়ে পড়তে পারে।

আধুনিক যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির দোহাই দিয়ে অনেকেই ধর্মীয় আচারকে তুচ্ছ, সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি পরিবার, একটি সমাজ কিংবা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিজেদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও পরিচয় অনেকাংশে আচারের মাধ্যমেই সংরক্ষণ করে। তাই আচার কেবল কিছু বাহ্যিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি নয়; এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামষ্টিক পরিচয়েরও বাহক।

একই সঙ্গে আচার ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে। মানুষ একা নয়; সে সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে ধর্মচর্চা করে। সেই সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখতে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে জীবন্ত রাখতে আচারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই আচারকে অযথা অবজ্ঞা করার কোনো কারণ নেই। তবে সব আচার সমানভাবে মূল্যবান নয়। যে আচার মানুষের ক্ষতি করে, অজ্ঞতা ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করে, বা কুসংস্কারের জন্ম দেয়, তা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু যে আচার মানুষকে সংযুক্ত করে, নৈতিক মূল্যবোধকে লালন করে এবং ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রকে রক্ষা করে, তাকে সংরক্ষণ ও লালন করা আমাদের দায়িত্ব।

ধর্মের পূর্ণতা তখনই আসে, যখন আচার ও অনুশীলন একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। বাহ্যিক আচারের মাধ্যমে আমরা ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হই, আর সচেতন অনুশীলনের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে নিজের জীবনের অংশ করে তুলি। তখন ধর্ম আর কেবল মন্দিরে পালন করা কোনো অনুষ্ঠান থাকে না; তা আমাদের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনযাপনের রূপান্তরকারী শক্তিতে পরিণত হয়।

(Dr. Upali Sraman, Lecturer in Buddhist languages and Cultures, University of Edinburgh, Scotland, UK)

তারা শুধু হাঁটে

তারা শুধু হাঁটে
প্রখর রৌদ্র
কিংবা বৃষ্টি
অথবা তীব্র তুষার ঝড়ে
হাঁটছে তো তারা হাঁটছেই
টেক্সাস থেকে জর্জিয়া হয়ে ক্যারোলিনা
সবশেষে যাবে ওয়াশিংটনে
দু’ডজন প্রায় বৌদ্ধ ভিক্ষু হাস্য বদনে
কেউ খালি পায়ে
কেউ বা শুধুই একটি কাপড়ে
“আলোক”নামের একটি কুকুরও হয়েছে সঙ্গী
যাত্রা তাদের থামছে না কিছুতেই
পথে পথে তারা শান্তির বাণী
করছে প্রচার
শত শত লোক
দেখছে অবাক –
দু’হাত বাড়িয়ে করছে বরণ
যেন চির চেনা আত্মীয় বা বন্ধু স্বজন
কারো চোখে জল
কারো মুখে হাসি উচ্ছাসে ভরা
ছোট ছেলে মেয়ে ফুল নিয়ে আসে
হুইল চেয়ারে বৃদ্ধ বৃদ্ধা
সবে ছুটে যায়
কিছু ক্ষণ শুধু শান্তির সহ যাত্রী হতে
ভিক্ষুরা পথে
হাঁটছে তো হাঁটছেই

Royal Mile -2

No lines of pine trees
in the city,
but other kinds of pines—

when the bagpiper lifts
his familiar tune,
Auld Lang Syne,
again and again.

A Bulgarian soprano
slips a smile,
perhaps a wink,
into her song
on the Royal Mile.

The knife juggler is gone,
winter is coming.

My robe looks
as fine as a Scottish kilt,
only a few inches longer
below the knee.

I know I am
a man of this world too,
as the echoes of Bella Ciao
float from Princes Street
through the air.

কখনো কখনো হয়তো কিছুটা উন্মাদ হতে হয়

কখনো কখনো হয়তো কিছুটা উন্মাদ হতে হয়
উপালি শ্রমণ

কখনো কখনো হয়তো কিছুটা উন্মাদ হতে হয়
আকাশের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা
চেয়ে চেয়ে হাত বাড়িয়ে অল্প সাদা মেঘ ছুঁতে
উন্মাদ ছাড়া কে আর চাইবে?
সুনীল গগনে সঞ্চিত কিছু বেদনার কথা,
অথবা কখনো বুক পেতে কারো চন্দ্রবিহীন কৃষ্ণ রাতের
গল্প শুনতে।
হয়তো সবারই মাঝেমাঝে কিছু উন্মাদ হতে হবে।

একদা যেমন বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ করাতে হয়েছে ঘোর উন্মাদ
দামোদর নদে তীব্র জোয়ার হেলা করে সে যে কেটেছে সাঁতার।

উন্মাদ বলে একজন বুড়ো শুধু লাঠি হাতে স্বপ্ন দেখেছে
একটি স্বাধীন ভারতের কথা,
দলিত সমাজে জন্ম নিয়েও আম্বেদকরও একটি সাম্য পৃথিবীর ছবি
এঁকে গেছে তার সংবিধানে।

উন্মাদ বলে জুলাইয়ের মাসে নির্ভীক সব তরুণ তরুণী
রাজপথে নেমে এসেছে যখন
বুক পেতে দিয়ে বলেছে “পুলিশ গুলি কর আজ
নিজের রক্তে আনবো ছিনিয়ে গণতন্ত্রকে”
পারেনি প্রবল ক্ষমতাশালীও শাসনে টিকতে।

আজকে যখন গাজায় শিশুরা মরছে ক্ষুধায়
সভ্যদেশের মুখ ঢেকে আছে কালো চশমারা
বড়ো বড়ো সব বিজ্ঞ লোকেরা টকশোগুলোয়
অবিরাম বলে যুক্তির কথা –
আরো এটমিক বোমের নিখুঁত কৌশল খুঁজে
উদ্ভাবনী উদ্যোক্তারা
এখন আবারো কিছু উন্মাদ আসুক জগতে।

কিছু উন্মাদ ঘৃনায় বাঁধানো কাঁটাতার ছিঁড়ে একতার কথা বলতে।
কিছু উন্মাদ ধর্মে বর্ণে বিভেদের মাঝে মজবুত সেতু গড়তে।
কিছু উন্মাদ নির্যাতিতের ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে।
কিছু উন্মাদ ধনীগরীবের সব ব্যবধান গুড়িয়ে চূর্ণ করতে।

মেঘে ঢাকা পথ?

হঠাৎ দেখি রাতে আকাশ নেমে আসে
হাজার কালো মেঘ আমাকে ছুঁয়ে যায়।
দুলছে ঝাউগাছ দুলছে বুনোফুল,
পাশেই উড়ে যায় ফিসেন্ট পাখি এক ।

আলোর শেষ দ্যুতি হঠাৎ নিভে যায়
পাতার ফাঁকে ফাঁকে স্বপ্ন অর্ধেক,
আসেনি ঝড় তবু ফুপিয়ে কান্নার
শব্দ দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসে।

স্নিগ্ধ কাঁচা ঘাসে সুদৃঢ় পদছাপ
এখনো খুঁজছে কি পুরোনো চেনা পথ,
অশ্বত্থমের সে কঠিন অভিশাপ
হবে না ক্ষয় তার আরো যে কত কাল !

অহল্যার চোখে এখনো ঘুমঘোরে
হয়তো ভেসে ওঠে পাথর মূর্তিটি,
রামের মৃদু ছোঁয়া স্মৃতি বা বিভ্রমে –
পাষাণী মূর্তিরা পায় কি চিরকাল?

গেলুগ সম্প্রদায়ে ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এর উপর তিব্বতি ভাষ্যগ্রন্থসমূহ

গেলুগ সম্প্রদায়ে ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এর উপর তিব্বতি ভাষ্যগ্রন্থসমূহ

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান রচিত বোধিপথপ্রদীপ তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সকল শাখা ও সম্প্রদায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বোধিলাভের পথ নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ সুসংহত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই গ্রন্থটি তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যে একটি মৌলিক ও প্রভাবশালী আকরগ্রন্থে পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষভাবে গেলুগ সম্প্রদায়ে এই গ্রন্থটির প্রভাব গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। পরবর্তী কালে গেলুগ পণ্ডিতদের বহু ভাষ্যরচনায় বোধিপথপ্রদীপ-এর দার্শনিক ভিত্তি, ধ্যানপদ্ধতি ও শিক্ষাক্রম স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিব্বতি বৌদ্ধ ইতিহাসে গেলুগ সম্প্রদায় ১৪শ শতকের শেষভাগে একটি সংস্কারমূলক আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ‘গেলুগ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ “পুণ্যের পথ” বা “কুশলের পথ।” এই ধারার প্রবর্তক ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত ও যোগী জে সংখাপা (১৩৫৭–১৪১৯)। গেলুগ ঐতিহ্য কঠোর বিনয় ও সাংঘিক শৃঙ্খলা, সুসংগঠিত শাস্ত্রচর্চা এবং মাধ্যমিক দর্শন ও তন্ত্রচর্চার সুশৃঙ্খল সমন্বয়ের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। অতীশের তিব্বতি শিষ্যদের মাধ্যমে প্রবর্তিত কাদাম শিক্ষার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সংখাপা ও তাঁর শিষ্যরা গান্দেন, সেরা ও দ্রেপুং—এই তিনটি প্রধান বিহার প্রতিষ্ঠা করেন, যেগুলি পরবর্তীতে তিব্বতের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গেলুগ সম্প্রদায় তিব্বতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারায় পরিণত হয়, এবং ২০শ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দালাই লামা এই সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতা ও তিব্বতের ধর্মনিরপেক্ষ শাসক হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন।
‘গেলুগপা’ শব্দটি তিব্বতি dge lugs pa শব্দগুচ্ছের ইংরেজি রূপ, যার অর্থ “পুণ্যের পথের অনুসারী” বা “পুণ্যময় ঐতিহ্যের প্রতিনিধি।” এখানে dge বোঝায় গুণ, সদ্গুণ বা নৈতিকতা; lugs বোঝায় ঐতিহ্য বা পদ্ধতি; আর pa একটি নামসূচক প্রত্যয়, যা কাউকে ঐতিহ্যের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করে। এই শব্দগুচ্ছ দ্বারা বোঝানো হয় সেইসব অনুশীলনকারী, যারা সংখাপা এবং তাঁর পরম্পরার পণ্ডিতদের নির্দেশিত জীবনচর্চা, শৃঙ্খলা ও দর্শন মেনে চলেন।
গেলুগ ঐতিহ্যের একটি মূল ধারণা ও অনুশীলনপদ্ধতি হলো লামরিম, অর্থাৎ “পথের ক্রমধারা।” এটি বোধিপথের স্তরভিত্তিক রূপায়ণ—প্রাথমিক বৈরাগ্য থেকে শুরু করে বোধিচিত্তের বিকাশ ও শূন্যতার উপলব্ধি পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করে। অতীশের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে সংখাপা এই পদ্ধতিকে সুসংগঠিতভাবে পুনর্গঠন করেন, যার ফলে লামরিম হয়ে ওঠে বৌদ্ধদর্শনের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা, এবং ধ্যানচর্চার একটি শক্ত ভিত্তি। গেলুগ সম্প্রদায়ে লামরিম সাংঘিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত অনুধ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে, যাতে অধ্যয়ন, মনন ও ধ্যানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে অনুশীলনকারীরা ধাপে ধাপে অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।
এই প্রবন্ধে আমরা বিশেষভাবে গেলুগ পণ্ডিতদের লেখা ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এর ভাষ্যগ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করব, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য লামরিম পদ্ধতির গভীরতর ব্যাখ্যা প্রদান। উল্লেখযোগ্য পণ্ডিতদের মধ্যে রয়েছেন (এখানে তাঁদের নামের উচ্চারণের বাংলা রূপ ব্যবহার করছি, যথাযথ বানান নয়):
১) জে সংখাপা লোবসাং দ্রাক্‌পা (১৩৫৭–১৪১৯), যিনি তাঁর লামরিম চেনমো (বৃহৎ লামরিম) রচনার মাধ্যমে সমগ্র বৌদ্ধপথকেই একটি নতুন কাঠামোতে রূপ দেন;
২) দাগপোর ঙাওয়াং দ্রাক্‌পা (১৫শ শতক);
৩) তৃতীয় দালাই লামা সোনাম জ্ঞাতসো (১৫৪৩–১৫৮৮);
৪) পঞ্চেন লোবসাং চোকি জ্ঞালসেন (১৫৭০–১৬৬২);
৫) জে গেন্দুন জাম্যাং;
৬) পঞ্চেন লোবসাং য়েশে (১৬৬৩–১৭৩৭);
৭) কংপো লামা য়েশে সোন্দ্রু (১৭৬১–১৮১৬);
৮) চতুর্থ আম্দো ঝামার গেন্দুন তেনজিন জ্ঞাতসো (১৮৫২–১৯১২);
৯) পাবোংকা রিনপোচে জামপা তেনজিন থিনলে জ্ঞাতসো (১৮৭৮–১৯৪১);
১০) ত্রিজ্যাং রিনপোচে লোবসাং য়েশে তেনজিন জ্ঞাতসো (১৯০১–১৯৮১)।
এই অধ্যায়ে আমি সংক্ষেপে গেলুগ ঐতিহ্যের ধারায় বোধিপথপ্রদীপ-এর উপর রচিত প্রধান ভাষ্যসমূহ এবং তাদের রচয়িতাদের পরিচয় উপস্থাপন করব। বিশেষ করে যেসব মহাপণ্ডিত লামরিম সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের জীবন ও রচনার মাধ্যমে অতীশের উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা কীভাবে বিকশিত হয়েছে সেটাই আলোচনা করবো । একই সঙ্গে, এটিও স্মরণ রাখতে হবে যে তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য বহু শাখাতেও বোধিপথপ্রদীপ-কে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র ভাষ্য রচনার চর্চা গড়ে উঠেছে, এবং বর্তমান সময়েও বহু তিব্বতী পণ্ডিত এই গ্রন্থের উপর মৌখিক ব্যাখ্যা প্রদান করে শিক্ষা দিয়ে থাকেন, যেগুলো অনেক সময় পরবর্তীতে লিখিত আকারে সংকলিত ও প্রকাশিত হয় ।
গেলুগ ঐতিহ্যের লামরিম ধারার রচয়িতাদের জীবন ও রচনাবলী একত্রে সংকলিত হয়েছে —লামরিম বংশপরম্পরার লামাদের জীবনী – নামের একটি বিখ্যাত গ্রন্থে যা সংকলন করেছেন য়োংজীন য়েশে জ্ঞালসেন (yongs ‘dzin ye shes rgyal mtshan)। এই গ্রন্থটি সমকালীন গবেষক এবং অনলাইন সংস্থান—যেমন The Treasury of Lives ও Jangchup Lamrim—এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় । এই অধ্যায়ে উপস্থাপিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য প্রধানত এই উৎসগুলোর উপর ভিত্তি করে সংগৃহীত হয়েছে।

সংখাপা

১৩৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিব্বতের আম্দো অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন সংখাপা লোব্সাং দ্রাক্‌পা (tsong kha pa blo bzang grags pa)। কিংবদন্তি অনুসারে, সংখাপার জন্মের পর যেখানে নাভিরজ্জু বা গর্ভফুল (প্লাসেন্টা ) নিক্ষেপ করা হয়েছে সেখানে একটি চন্দন গাছ জন্ম নিয়েছিল, যার পাতায় মঞ্জুশ্রীর প্রতীক উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে। এই অলৌকিক স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করতে পরে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কুম্বুম মহাবিহার।
শৈশব থেকেই সংখাপা ছিলেন অসাধারণ মেধাসম্পন্ন, কৌতূহলী ও ধর্মনিষ্ঠ। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাদাম ঐতিহ্যের গুরু দোন্দ্রুব রিনচেনের (chos rje don grub rin chen, 1309-1385) কাছে শ্রামণ্য প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এই গুরুই তাঁকে বজ্রভৈরব সাধনায় দীক্ষিত করেন এবং এই প্রতিভাবান বালককে পাণ্ডিত্যের এক পরিপূর্ণ আধার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বতোভাবে সহায়তা করেন। কথিত আছে, মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ও বজ্রপাণির দর্শন (ভিশন) লাভ করেন। এটি ছিল তার জীবনে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা যা পরবর্তীতে তাঁর আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার ভিত্তি গঠনে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৈশোরে সংলাপ তিব্বতের উঃ সাং তথা কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গমন করেন এবং এরপর আর কখনো তাঁর জন্মভূমিতে ফিরে যাননি। উ-সাং অঞ্চলে অবস্থানকালে তিনি পঞ্চাশেরও অধিক গুরু ও আধ্যাত্মিক শিক্ষকের নিকট শিক্ষালাভ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রেনদাওয়া ঝোন্নু লোদ্রো (rje btsun red mda’ ba gzhon nu blo gros) এবং সাক্য ও কাদাম ঐতিহ্যের বিশিষ্ট পণ্ডিতগণ, এবং জোনাং ও দ্রিগুং ধারার তান্ত্রিক গুরুগণ। তাঁর দার্শনিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নাগার্জুন ও চন্দ্রকীর্তির মধ্যমক দর্শন, যা তিনি যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বোধিপথের অনুশীলনের আলোকে সুদৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর রচিত সুবর্ণ মালা (The Golden Garland) ও যুক্তির সমুদ্র (Ocean of Reasoning) গ্রন্থদ্বয় এই গভীর অনুধ্যানের প্রামাণ্য নিদর্শন।
সংখ্যাপার চিন্তাধারায় অতীশ দীপঙ্করের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। শুধুমাত্র শৈশবকালীন দর্শন নয়, বরং তাঁর রচনাতেও অতীশের দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর সর্বাধিক প্রভাবশালী রচনা লামরিম চেনমো (বৃহৎ লামরিম) সরাসরি অতীশের বোধিপথপ্রদীপ এর দ্বারা প্রভাবিত । এই গ্রন্থে মধ্যমক যুক্তির বিশ্লেষণ, বিনয় শাসনের গুরুত্ব এবং যোগ-তন্ত্র সাধনার গভীরভাবে সমন্বিত হয়েছে। অতীশের মতো সংখাপাও বুদ্ধির চর্চা, ধৈর্যের সাথে আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও যুক্তিশীল বিশ্লেষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তাঁকে সমকালীন অন্যান্য তান্ত্রিক গুরুদের থেকে আলাদা করে তোলে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তিনি গঠন করেন গেলুগ ঐতিহ্য—যা অতীশের ঐতিহ্যকে আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত আকারে উপস্থাপন করে। পরিণত জীবনে সং খাপা প্রতিষ্ঠা করেন গান্দেন মহাবিহার, সূচনা করেন মোনলাম চেনমো বা মহাপ্রার্থনা চর্চার উৎসব, এবং রচনা করেন অসংখ্য তান্ত্রিক ও দার্শনিক গ্রন্থ, বিশেষত গুহ্যসমাজ তন্ত্রের ওপর। সং খাপার জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো চীনা মিং সম্রাটের আমন্ত্রণ। এই আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও তিনি চিন ভ্রমণে নিজে না গিয়ে তাঁর শিষ্য শাক্য য়েশে-কে (byams chen chos rje shAkya ye shes) পাঠান, যিনি পরবর্তীতে ফিরে এসে সেরা মহাবিহার (se ra dgon pa) প্রতিষ্ঠা করেন ।
১৪১৯ সালে সং খাপার মহাপ্রয়াণ ঘটে গান্দেন বিহারেই (dga’ ldan)। সেখানে তাঁর দেহ রত্নখচিত স্তূপে সমাধিস্থ করা হয়, এবং এই দিনটি এখনো ‘গাদেন ঙ্গাচো’ নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে শ্রদ্ধাভরে পালিত হয়।
তাঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গ্যালৎসাবজে দর্মা রিনচেন (rgyal tshab rje dar ma rin chen, 1364-1432), খেদ্রুবজে (mkhas grub rje dge legs dpal bzang, 1385–1438), শাক্য য়েশে এবং গেন্দুন দ্রুব (dge ‘dun grub pa; 1391–1474) । এর মধ্যে গেন্দুন দ্রুব পরবর্তীকালে প্রথম দালাই লামা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এই শিষ্যগণ গান্দেন, সেরা ও দ্রেপুং মহাবিহার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সং খাপার আদর্শ ও শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেন সর্বত্র। এভাবেই অতীশের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার সং খাপার মাধ্যমে প্রবেশ করে এক নতুন যুগে—যেখানে নৈতিক শৃঙ্খলা, বিশ্লেষণাত্মক বোধি ও তন্ত্র-যোগের সমন্বয় একটি সুসংগঠিত বৌদ্ধপথের ভিত্তি রচনা করে।
অতীশ দীপঙ্করের বোধিপথপ্রদীপ গ্রন্থ থেকে প্রেরণা নিয়ে সং খাপা রচনা করেন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যগ্রন্থ। এই রচনাগুলোর কাঠামো মূলত অতীশের পথনির্দেশনার অনুসরণে নির্মিত, তবুও এগুলো সরাসরি শ্লোক-অনুশ্লোক ভাষ্য নয়। বরং সং খাপা বোধিপথপ্রদীপ-এর মূল কাঠামোকে ধারণ করে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও বৌদ্ধ অনুশীলনের অন্তর্দৃষ্টি যুক্ত করে নতুন ব্যাখ্যার পথ নির্মাণ করেন।
এই পাঁচটি গ্রন্থ হলো:
১। লামরিম চেনমো – বোধিপথের ক্রমান্বয়ে স্তরবিন্যাসবিষয়ক বৃহৎ গ্রন্থ
২। লামরিম ড্রিং পো – মধ্যম আকারের লামরিম গ্রন্থ
৩। লামরিম দুয়ে দোন – সংক্ষিপ্ত লামরিম, যা লামরিম ন্যাম গুর নামেও পরিচিত
৪। লাম ৎসো নাম সুম – পথের তিনটি মুখ্য উপাদান
৫। য়োন তেন শির গ্যুর মা – সমস্ত গুণের ভিত্তি
এই গ্রন্থসমূহ কেবল অতীশের দর্শনের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ করেনি, বরং তার ধারণাকে বিশ্লেষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এর মাধ্যমে সং খাপা শুধু একটি নতুন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পথপ্রদর্শক হননি, বরং বৌদ্ধ ভাবনার একটি সুগঠিত ও যুক্তিনির্ভর পরিসরও নির্মাণ করেন, যা আজও তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি হিসেবে সমাদৃত হয় ।

১। লামরিম চেনমো ( বৃহৎ লামরিম )
বোধিসত্ত্বপথ সংক্রান্ত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে লামরিম চেনমো—অর্থাৎ ‘বোধিপথের স্তরবিন্যাসবিষয়ক মহাগ্রন্থ’—সবচেয়ে বিস্তৃত ও সুসংগঠিত রচনা হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় দেড় হাজার পৃষ্ঠার এই বিশাল আকারের গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে Lamrim Chenmo Translation Committee, যার প্রধান সম্পাদক ছিলেন জোশুয়া ডব্লিউ. সি. কাটলার এবং সম্পাদক ছিলেন গাই নিউল্যান্ড। বইটি প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Snow Lion Publications-এর মাধ্যমে।

জে সং খাপার এই রচনার প্রথম খণ্ডে বোধিপথের ভিত্তি নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য আবশ্যক মৌলিক ধারণা ও মানসিক প্রস্তুতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সূচনায় অতীশের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়েছে এবং তাঁর বোধিপথপ্রদীপ-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। এরপর সংখাপা একজন যোগ্য আচার্যের গুরুত্ব, শিক্ষার মহানতা, জীবন ও ভবিষ্যৎ জন্মের অনিত্যতা, তিন রত্নে আশ্রয়, নৈতিকতা ও কর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি অধম (প্রথম) ও মধ্যম ক্ষমতার অনুশীলনকারীদের জন্য ত্যাগ, দুঃখচিন্তা ও আত্মমুক্তির পথ বিশ্লেষিত হয়েছে।
দ্বিতীয় খণ্ডে মহাযান বোধিসত্ত্বপথে উত্তম ক্ষমতাসম্পন্ন অনুশীলনকারীদের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে—যাঁরা সকল জীবের কল্যাণে পরিপূর্ণ বোধিপ্রাপ্তির সাধনায় ব্রতী হন । এখানে করুণাকে মহাযানে প্রবেশের প্রধান দ্বার হিসেবে চিহ্নিত করে বোধিচিত্ত সৃষ্টির দুটি মুখ্য পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে: (১) কার্য-কারণ নির্ভর সাতপর্যায়ে বিশিষ্ট পদ্ধতি এবং (২) আত্ম-পরের স্থানবিনিময় অনুশীলন। এর পর ছয় পরমিতা—দান, শীল, ক্ষান্তি, উদ্যম/বীর্য, ধ‍্যান এবং প্রজ্ঞা—প্রত্যেকটির গুণ অত্যন্ত বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এগুলো কেবল আত্মশুদ্ধির জন্য নয়, অপরের কল্যাণ সাধনেও সহায়ক। এছাড়া বোধিসত্ত্বদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা ও মানসিক প্রশিক্ষণের নির্দেশনাও এই খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় ও শেষ খণ্ডে উপস্থাপিত হয়েছে চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধির লক্ষ্যে উন্নত ধ‍্যানচর্চার নির্দেশনা। এটি দুটি অংশে বিভক্ত—(১) শমথ ধ্যান এবং (২) প্রজ্ঞা (বিপশ্যনা ) চর্চা। প্রথম অংশে মনোসংযোগ, মানসিক উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ ও ধ‍্যানের স্থিতি অর্জনের কৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে, শূন্যতা এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ ধারণাকে কেন্দ্র করে প্রজ্ঞা-চর্চা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংখাপা এখানে বিভ্রান্তিকর ধারণা ও আধ্যাত্মিক চর্চার পরিপন্থী মতবাদের নির্মোহ বিশ্লেষণ করেন এবং মধ্যমক দর্শনের প্রসঙ্গে স্বাতন্ত্রিক ও প্রাসঙ্গিক (Svātantrika-Prāsaṅgika) শাখার সূক্ষ্ম পার্থক্য উদঘাটন করেন।
গ্রন্থের শেষাংশে শমথ ও বিপশ্যনার সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা উপস্থাপন করেন—যা পাঠককে বোধিপথে দৃঢ়পদে অগ্রসর হওয়ার শক্ত কাঠামো প্রদান করে।

২। লামরিম ড্রিং পো (বোধিপথের স্তরবিন্যাস বিষয়ক মধ্যম গ্রন্থ)
সংখাপার রচিত ‘মধ্যম লামরিম’ মহাযান বোধিপথের একটি সুশৃঙ্খল এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনা। আধুনিক মুদ্রণে প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠায় সীমিত হলেও এটি মূলত তাঁর বৃহৎ গ্রন্থ লামরিম চেনমো-র সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, যেখানে মৌলিক তাত্ত্বিক কাঠামো ও শিক্ষাদানের সুসংবদ্ধ রীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এই গ্রন্থের বিষয় বস্তুও প্রথম/অধম, মধ্যম, এবং উত্তম ভেদে ভাগ করা হয়েছে। সংখাপা ধাপে ধাপে নৈতিক প্রস্তুতি ও মানসিক পরিপক্বতার মাধ্যমে পাঠককে বোধিসত্ত্বপথের গভীর অনুশীলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।
গ্রন্থটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো: উন্নত চর্চায় প্রবেশের আগেই মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ। গুরুর প্রতি নির্ভরতা, মানবজন্মের দুর্লভতা নিয়ে ভাবনা, মৃত্যু ও অনিত্যতা সম্পর্কে ধ্যান—এই প্রাথমিক অনুশীলনগুলোকে আধ্যাত্মিক উন্নতির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই গ্রন্থ শুরু হয়েছে শিষ্যের মানসিক প্রস্তুতি ও আচার্যের প্রতি নির্ভরতার আলোচনা দিয়ে। এরপর অধম বা প্রথম ও মধ্যম স্তরের ব্যক্তিদের উপযোগী অনুশীলন, এবং শেষে উত্তম সাধকদের জন্য বোধিসত্ত্বপথের দিকনির্দেশ। মূল আলোচনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ হলো কর্ম ও পুনর্জন্ম, শীলাচরণ, করুণার মাধ্যমে বোধিচিত্তের বিকাশ এবং ছয় পরমিতা—দান, শীল, ক্ষান্তি, উদ্যম, ধ‍্যান ও প্রজ্ঞা। এখানেও শমথ এবং প্রজ্ঞা (বিপশ্যনা) অনুশীলনের জন্য সংখাপা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বিশদ নির্দেশনা প্রদান করেছেন, বিশেষ করে কিভাবে অজ্ঞতা দুঃখের মূল এবং আত্মশূন্যতার দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করতে হয় তা তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রার্থনা, ভক্তিমূলক-গীতি ও বজ্রযান চর্চা সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা এই রচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একদিকে যেমন এটি ভক্তিভাব ও নিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত, তেমনি বিশ্লেষণাত্মক উপলব্ধিতেও দীপ্ত—একটি পরিপূর্ণ, পথনির্দেশক গ্রন্থ। বৃহৎ লামরিম চেনমো এবং মধ্যম লামরিম চেনমো—এই দুই গ্রন্থেই অতীশের মৌলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত হয়েছে।
৩। লামরিম দুয়ে দোন (বোধিপথের স্তরবিন্যাসবিষয়ক সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ)
লামরিম ন্যামস গুর নামেও পরিচিত প্রায় ত্রিশ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি সংখাপা তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্য ঙাওয়াং দ্রাকপার অনুরোধে রচনা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। এখানে বৌদ্ধ পথের সারাংশ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘সৌভাগ্যবানদের মুক্তির প্রবেশদ্বার’ নামে পরিচিত এই গ্রন্থটি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে তিনটি মুখ্য উপাদান: ত্যাগবৃত্তি (নৈষ্ক্রম্য), বোধিচিত্ত, এবং শূন্যতাবোধ (সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি)। যদিও এটি ব্যক্তিগত উপদেশ, এর সার্বজনীন ভাষা এমন যে যারা সংসারবন্ধন থেকে মুক্তি কামনা করেন এবং প্রজ্ঞা ও করুণার মিলনে অনুপ্রাণিত, তাঁদের সকলের জন্য এটি প্রযোজ্য।
গ্রন্থের সূচনায় সংখাপা আহ্বান: “হে মুক্তি কামনাকারী সৌভাগ্যবান, নির্মল মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর”—এই বাক্য গ্রন্থটিকে একাধারে আন্তরিক উপদেশ ও সার্বজনীন দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই রচনায় তিন উপাদানকে পৃথকভাবে নয়, বরং আন্তঃসম্পর্কিত ও সহবিকাশযোগ্য উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ত্যাগবৃত্তির সূচনা হয় অনিত্যতা ও পার্থিব সুখের অসারতা উপলব্ধির মাধ্যমে; বোধিচিত্ত উদ্ভব হয় নিঃস্বার্থ করুণাবোধ থেকে; এবং শূন্যতা বোধের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি—যা মধ্যমক যুক্তির ভিত্তিতে নির্মিত—সংসারের মূল জড়তা কাটাতে সহায়ক। সংখাপা বলেন, “ত্যাগবৃত্তি ছাড়া সংসারের আকাঙ্ক্ষা প্রশমিত হয় না… বোধিচিত্ত ছাড়া পূর্ণ বোধিলাভের ইচ্ছা জন্মায় না… আর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া সংসারের মূল কাটা যায় না।”
সূত্রযান ও তন্ত্র—উভয় ধারার প্রজ্ঞাসিদ্ধ অনুশীলন থেকে আহৃত এই গ্রন্থ যুক্তির সূক্ষ্মতা ও হৃদয়ের ভক্তির অপূর্ব সমন্বয়। গ্রন্থের উপসংহারে কাদম্পা গুরুদের স্মরণ করা হয়। এই গ্রন্থের ম্যাধ্যমে সংখাপা স্মরণ করিয়ে দে প্রকৃত উপলব্ধি অর্জিত হয় অধ্যয়নের পাশাপাশি নৈতিক আচরণ, একাগ্র চর্চা ও ধ্যানে নিমগ্নতার মাধ্যমে। এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর রচনাটি শুধু আত্মবোধের একটি মানচিত্র নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টি ও বিমুক্তির সম্ভাবনার একটি দীপ্ত প্রতিফলন।

৪। লাম ৎসো নাম সুম (পথের তিনটি মুখ্য উপাদান)
চৌদ্দটি শ্লোক বা গাথায় রচিত এই সংক্ষিপ্ত রচনাটি বিশেষভাবে তার শিষ্য ঙাওয়াং দ্রাকপার উদ্দেশ্যে লেখা হলেও, এটি সকল সাধকের জন্য এক সুস্পষ্ট ও সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা।প্রত্যেকটি স্তবক যেন আধ্যাত্মিক চর্চার সোপানে একেকটি ধারাবাহিক ধাপ: যেগুলো মানবজন্মের দুর্লভতা উপলব্ধি থেকে শুরু করে সমস্ত প্রাণীর প্রতি করুণাবোধ, এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি ও বাস্তবতার প্রকৃতি উপলব্ধির লক্ষ্যে নিয়ে যায় । আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও, এই রচনাটি তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

৫। য়োন তান শির গ্যুর মা (সমস্ত গুণের ভিত্তি)
‘সকল সদ্গুণের ভিত্তি’ একটি সংক্ষিপ্ত তিব্বতী প্রার্থনা। এটিও চৌদ্দটি শ্লোক বা গাথায় রচিত। প্রতিটি স্তবক লামরিম ধারাক্রম অনুযায়ী বোধিপথের স্তরগুলোকে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরে—গুরু-নির্ভরতা থেকে শুরু করে ত্যাগবৃত্তি, বোধিচিত্ত ও শূন্যতাবোধ এবং শেষ পর্যন্ত তন্ত্রের দ্বৈত ও অদ্বৈত সাধনার পূর্ণতা। এই গ্রন্থটি আকারে ছোট হলেও, দর্শনের স্পষ্টতা ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ভক্তির মাধ্যমে এটি তিব্বতী বৌদ্ধদের নিত্য অনুশীলনে একটি অপরিহার্য প্রার্থনা হিসেবে স্থান পেয়েছে। এর অন্তর্নিহিত প্রার্থনা—জন্মে জন্মে নির্ভুল দিশা ও পরিপূর্ণ বোধিসিদ্ধির আকাঙ্ক্ষা—সংখাপার সামগ্রিক শিক্ষার সারকথা ধারণ করে।

আলোর উৎসব

আলোর উৎসব
উপালি শ্রমণ

গভীর অরণ্যে সঘন তমসায়
সহজে দিন রাত যায় না করা ভেদ,
বানর রাজা এক ঠান্ডা কুয়াশায়
গাছের ডালে খোঁজে আলোর সংকেত।
হঠাৎ দেখে তার পত্র পল্লবে
করিছে ঝিকমিক সুদূরে ক্ষীণ আলো ,
সেদিকে ছুটে যায় অগ্নি উৎসবে
ইচ্ছে একটাই ‘ধ্বংস হোক কালো’।
ছোটে সে পিছু পিছু অগ্নিকণাটির
বনের মাঝে যেন ক্ষুদ্র মরীচিকা,
কিছুটা দেহ-তাপ উষ্ণতা সে পায়
এতেই ফেপে ওঠে বানরে অহমিকা।
দম্ভে নাচে আর চেঁচায় উল্লাসে
“বুদ্ধি আমার যে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত,”
জোনাক পোকা এক সুদূরে মৃদু হাসে
“বানর রাজা তুমি সত্যি আলোকিত।”